Header Ads

  • Breaking News

    পদ্মার গর্ভেই কি হারিয়ে যাবে শিশুদের স্কুলটি


    যেখানে কেটেছে ছোট্ট শিশুজীবনের চারটি বছর। পরম মমতার প্রতিচ্ছবি প্রিয় বিদ্যালয়। অনেক প্রিয় মুখের বন্ধুত্ব; বন্ধন; চারণভূমি। আর শিক্ষকদের ভালোবাসা মিশ্রিত সোহাগ; রাগ; শাসন। সকাল থেকে বিকেল কিংবা ঝাঁঝালো দুপুর প্রতিনিয়তই স্পর্শ লেগেছে যে আঙিনায়। মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার পথে দূর থেকে দেখেই চিৎকার করে বলত, ‘মা; ওই যে আমাদের স্কুল’। আর বিদ্যার্জনের সেই আঁতুড়ঘর থেকে মাত্র ১০ ফুট দূরে অবস্থান করছে উত্তাল পদ্মা। একের পর এক ঢেউ আছড়ে পড়ছে পাড়ে। ঢেউয়ের তালে একটু একটু করে নিঃশেষ হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে নদীর ভেতর। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ুয়া রাকিব স্কুলে এসেই থমকে দাঁড়ায়। ভয়ার্ত নয়নজোড়া একবার তাকায় প্রিয় স্কুলে তার ক্লাসরুমের পানে আরেকবার তাকায় আগ্রাসী পদ্মার ফেনিল ঢেউয়ের দিকে। কোনো কিছুতেই মনকে বোঝাতে ব্যর্থ হওয়া রাকিবের মতো আরো দেড় শতাধিক প্রিয় শিশু শিক্ষার্থীর বর্ণমালার কলরবে আর কি মুখরিত হবে না এই বিদ্যালয়। নাকি ইতিহাসের অতল মঞ্চেই এ স্কুলের যবনিকা পর্ব লেখা থাকবে?

    ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় বিদ্যালয়টি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। এতে বিদ্যালয়ের দেড় শতাধিক ছাত্রছাত্রীর পড়ালেখা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। চোখের সামনে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে প্রিয় বিদ্যালয়টির মাঠ। যেকোনো সময় স্কুলের ভবন গিলে খাবে নদী। তাই ছোট ছোট শিশু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা তো বসে থাকতে পারে না। সাবেক-বর্তমান ছাত্র, এলাকাবাসী ও শিক্ষকরা মিলে ভাঙন ঠেকাতে বাঁধ আর বালুভর্তি বস্তা ফেলছে নদীতে স্কুল রক্ষার জন্য। যদি বাঁচানো যায় স্কুলটিকে।

    মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পদ্মার পাড়ে অবস্থিত কুষ্টিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রায় শত বছরের পুরনো স্কুলটির দু’টি ভবন দাঁড়িয়ে আছে সর্বনাশা পদ্মার পাড়ে। তার পরও থেমে নেই স্কুলের পাঠদান। স্কুলের ছোট ছোট শিশু ও শিক্ষকরা মিলে ভাঙন ঠেকাতে বাঁধ আর বালুভর্তি বস্তা ফেলছে নদীতে। স্থানীয়রা জানান, স্কুল থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ছিল পদ্মা নদী কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানেই স্কুলটি নদীভাঙনের মুখে পড়েছে। কর্তৃপক্ষ নদীভাঙন ঠেকাতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় এ বছর হুমকির মুখে পড়েছে স্কুলের ভবন দুটি। কুষ্টিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো: শামিমুর রহমান জানান, বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে চারজন শিক্ষক, তিনজন শিক্ষিকাসহ প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। আগে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অনেক বেশি থাকলেও নদীভাঙনের শিকার হওয়ায় বিদ্যালয় থেকে দিন দিন কমে যাচ্ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। স্কুলের ভিটেমাটি প্রায় পুরোটাই চলে গেছে, ভবন দুটিও যায় যায় অবস্থা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সহায়তা না পেয়ে স্থানীয় আরুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দেয়া আর্থিক ১০ হাজার টাকা সহায়তায় স্কুলের ভাঙন রোধ করতে সামান্য বাঁধের চেষ্টা করছি। খুদে শিক্ষার্থীদের নিয়েই কোনো রকমে বাঁশ আর বালুর বস্তা ফেলে নদী শাসনের কাজ করছি। ওদের দেখাদেখি স্কুলটি রক্ষায় কিছু সাবেক ছাত্রছাত্রীও এগিয়ে এসেছে সাহায্যের জন্য।

    এই বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মো: আক্কাছুর রহমান জানান, আমাদের এলাকার মান্দ্রাখোলা, কুষ্টিয়া, আরোয়া, জগতদিয়া, দক্ষিণ সালজানা মিলে পাঁচটি গ্রামের ছেলেমেয়েরা এই স্কুলে লেখাপড়া করে। শত বছরের পুরনো এই স্কুলটি আমাদের চোখের সামনেই আজ নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারছি না। মনের সান্ত্বনা পেতে তাই নিজেরা সামান্য বাঁধ দেয়ার চেষ্টা করছি।

    প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা করা হতো তাহলে শত বছরের ঐতিহ্যের স্কুলটি রক্ষা পেত। কুষ্টিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য মো: হাতেম আলী জানান, আমরা কয়েক দফা চেষ্টা করেছি স্কুলটি রক্ষা করার। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছি না। একসময় আমরা এই স্কুলে পড়েছি। আমার ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করেছে। এখন আমার নাতি-নাতনীরা এই স্কুলে লেখাপড়া করছে। আমাদের পাঁচ গ্রামের মধ্যে এই একটি মাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলটি ভেঙে গেলে আমাদের পাঁচ গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর সহায়তা পেলে স্কুলটি রক্ষা করা সম্ভব, তাই আমি জোর দাবি জানাই স্কুলটি রক্ষার্থে যেন সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন।

    শিবালয়ের আরুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকতারুজ্জামান খান মাসুম জানান, বিদ্যালয়টি রক্ষার জন্য এখনই যদি পরিকল্পিত ও দীর্ঘস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও বালুর বস্তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না করা হয়, তাহলে নিশ্চিত বিলীন হয়ে যাবে কুষ্টিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। শিক্ষার হাতেখড়ি থেকে বঞ্চিত হবে মান্দ্রাখোলা, কুষ্টিয়া, আরোয়া, জগৎদিয়া ও দক্ষিণ সালজানাসহ কয়েটি গ্রামের ছেলেমেয়েরা।

    No comments

    Post Top Ad

    ad728

    Post Bottom Ad