Header Ads

  • Breaking News

    আওয়ামী লীগে নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ


    কুমিল্লার সংসদীয় আসনগুলোর দু-একটি বাদে অন্যগুলোতে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান ভালো। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলটির নেতাকর্মীরা বলছে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে দলটি ভালো করবে। অপরদিকে উত্তর ও দক্ষিণ দুটি সাংগঠনিক জেলায় আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগই। নেতাকর্মীরা বলছে, আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে দলীয় কোন্দল নিরসন না হলে এখানে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির আশঙ্কা আছে।
    নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই বলতে গেলে সবচেয়ে ভালো করেছে আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের ওই নির্বাচনে কুমিল্লার ১১টি আসনের মধ্যে ৯টি তাদের দখলে যায়। এর আগে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ১২ আসনের মধ্যে সাতটিতে আওয়ামী লীগ জিতেছিল। ২০০১ সালে একটি আসনও পায়নি দলটি।
    জাতীয় নির্বাচনে জেলায় যখন আওয়ামী লীগের এমন অবস্থা তখন দলে কোন্দল চরমে রয়েছে। কোন্দলের কারণে আওয়ামী লীগ সমর্থক নেতা খুনের ঘটনাও ঘটেছে এখানে। এসব কারণে দলের নেতাকর্মীরা মনে করছে, আগামী বছর কুমিল্লা হবে আওয়ামী লীগের জন্য ঝুঁকির বছর। এখন থেকেই সাবধান না হলে দলের অবস্থা সামনে শোচনীয় হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
    স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা এবং ছেলেকে এলাকার রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষার কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকেই অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন কুমিল্লা-১ আসনের (দাউদকান্দি-হোমনা) সংসদ সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া। বালুমহালের ভাগ আর এ নিয়ে হত্যাকাণ্ডের কারণে ‘ক্লিন ইমেজের’ রাজনীতিবিদ সুবিদ আলী চাপা পড়তে বসেছেন।
    জানা গেছে, সুবিদ আলীর আশপাশে নেই আওয়ামী লীগের প্রকৃত নেতাকর্মীরা। তাঁর সঙ্গে সরাসরি বিরোধ রয়েছে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল আওয়াল সরকার, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকার, দাউদকান্দি উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবুল হাসেম সরকার, সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব চৌধুরী লিল মিয়া ও আরেক নেতা বাদল রায়ের সঙ্গে। তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাদেরও দেখা যায় না তাঁর সঙ্গে।
    জানা গেছে, এলাকার রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেতে সুবিদ আলীর ছেলে মোহাম্মদ আলী সুমন প্রথমে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে প্রার্থী হন। এ নিয়ে বিরোধের জের ধরে তিন দফা সম্মেলন ডেকেও করা যায়নি। পরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা বীর বাহাদুরের উপস্থিতিতে সম্মেলনে আবুল হাসেম সরকারকে সভাপতি ও আহসান হাবিব চৌধুরী লিল মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এরপর মোহাম্মদ আলী উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে প্রার্থী হন। ওই পদে দাউদকান্দির আরেক নেতা আবদুল আওয়াল সরকার নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু জেলা সম্মেলনে তাঁর নামও প্রস্তাব করা হয়নি। সম্মেলনে আবদুল আওয়াল সরকার সভাপতি ও জাহাঙ্গীর আলম সরকার সাধারণ সম্পাদক হন। এরপর উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন মোহাম্মদ আলী। এ নিয়েও বিরোধ চরমে ওঠে। আওয়ামী লীগের যাঁরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন তাঁদের মনোনয়ন জোর করে প্রত্যাহার করতে বাধ্য করেন। বিএনপির এক প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়ে যায় সকাল ১১টার দিকেই।
    জানা গেছে, উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক শাহজাহান খন্দকার ও সদস্যসচিব আলামিন খন্দকার ছাত্রলীগ নেতা রাজন হত্যা মামলায় আসামি। উপজেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক আক্তারুজ্জামানও হত্যা মামলার আসামি। এ তিনজনই সুবিদ আলীর ছেলে মোহাম্মদ আলী সুমনের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। যুবলীগের ইউনিয়ন সম্মেলন মঞ্চে সংসদসদস্য সুবিদ আলী ভূঁইয়ার সামনে প্রতিপক্ষরা গুলি করে আহত করে ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা মাহবুব আলম সবুজকে। মোহাম্মদ আলী সুমনের দাবি, তাঁর বাবা সুবিদ আলী ভূঁইয়াকে হত্যার চেষ্টার অংশ হিসেবেই এ গুলির ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারী ‘মোক্কারমকে’ পুলিশ খুঁজছে। সব মিলিয়ে দাউকান্দিতে সুবিদ আলী ও তাঁর ছেলে মোহাম্মদ আলী সুমনের ভাবমূর্তি আগের চেয়ে ম্লান।
    তবে মেজর (অব.) মোহাম্মদ আলী সুমন বলেন, ‘দাউদকান্দিতে আওয়ামী লীগ এখন অনেক শক্তিশালী। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর খুনি মোশতাকের এলাকা দাউদকান্দির আসনটি ৩৫ বছর পর আমরা ফিরে পেয়েছি। বিএনপির ড. খন্দকার মোশারফ হোসেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে জেনারেল সুবিদ আলী ভূঁইয়ার বিকল্প নেই। ’
    কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। অন্যদিকে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যাও কম নয়। আগেরবার নির্বাচন করা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ আবদুল মজিদ, জনতা ব্যাংকের পরিচালক সেলিমা আহমেদ মেরী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান পারভেজ হোসেন সরকার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন এবার মনোনয়ন পেতে। কিন্তু গুঞ্জন রয়েছে দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ আসন থেকে নির্বাচনের জন্য কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি না আসায় এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য হওয়ায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির মো. আমির হোসেন।
    কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনটি গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেয় আওয়ামী লীগ। মনোনয়ন পেয়েও প্রত্যাহার করতে হয় উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী আকতার হোসেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন। চলতি বছর ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ায় আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন তিনি। তবে এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশায় জোর লবিং চালাচ্ছেন জাহাঙ্গীর আলম সরকার।
    কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনটিও গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেয় আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ইকবাল হোসেন রাজুকে পরাজিত করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের তত্কালীন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রাজী মোহাম্মদ ফখরুল। তাঁকে আওয়ামী লীগ দল অন্তর্ভুক্ত করায় এবং তাঁর বাবা দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সাবেক মন্ত্রী এ এফ এম ফখরুল ইসলাম মুন্সীর বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আগামী নির্বাচনে তাঁর মনোনয়ন পাওয়া নিশ্চিত বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে দলের মধ্যে রয়েছে তাঁর শক্ত প্রতিপক্ষ। এ তালিকায় আছেন সাবেক মন্ত্রী এ বি এম গোলাম মোস্তফা, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এম হুমায়ূন মাহমুদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রওশন আলী মাস্টার। রাজী ফখরুলকে মনোনয়ন দেওয়া হলে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হতে পারেন হুমায়ূন মাহমুদ ও রওশন আলী মাস্টার। আসনটি আবার ফিরে পেতে যাচ্ছে বিএনপি—এমনটা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও মনে করে। কুমিল্লা-৫ (চান্দিনা) আসনে স্বাধীনতার পর থেকে এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করে আছেন উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সংসদ সদস্য মো. আলী আশরাফ। চান্দিনায় সংসদীয় নেতা মানে আওয়ামী লীগের আলী আশরাফ। চারবার নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে চান্দিনার প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন সাবেক এই ডেপুটি স্পিকার। ৪০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি চান্দিনার ক্লিনম্যান হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু দশম সংসদ নির্বাচনের পর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকে শুরু করে পৌর নির্বাচন পর্যন্ত সব স্থানীয় নির্বাচনে ‘মনোনয়ন বাণিজ্যের’ কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে বিতর্কিত হয়ে পড়েন তিনি। এ ছাড়া তাঁর একমাত্র ছেলে দেশের বণিক সমিতিগুলোর ফেডারেশন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি মুনতাকিম আশরাফ টিটুর বিরুদ্ধে ইউপি চেয়ারম্যান-সদস্য ও মেয়র-কাউন্সিলর প্রার্থীদের ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ করার অভিযোগ রয়েছে। আলী আশরাফের কাছে যথাযথ মূল্যায়ন না পেয়ে অনেক নেতাকর্মী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের পাশে ভিড়তে শুরু করে। এ কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগে এখন দুটি ধারা। প্রাণ গোপাল দত্ত ঢাকায় ভোটার হলেও সম্প্রতি তা স্থানান্তর করে চান্দিনায় আনার কারণে আগামী নির্বাচনে তিনি এ আসনে প্রার্থী হতে পারেন—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ ছাড়া উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের গত সম্মেলনে অধ্যাপক ড. প্রাণ গোপাল দত্তকে সহসভাপতি পদ দেওয়া হয়। এ কারণে অধ্যাপক প্রাণ গোপালকে দল মনোনয়ন দেবে—এমনটাই প্রত্যাশা বেশির ভাগ নেতাকর্মীর।
    কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব না থাকলেও দুই শীর্ষ নেতা সভাপতি পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও সাধারণ সম্পাদক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক মুজিবের মধ্যে খুব যে সখ্য রয়েছে তেমন নয়। বরং কুমিল্লা জেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায়। জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করে নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) আবু তাহেরকে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় এবং দল থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিষয়ে কোনো বাধা না থাকায় সে সময় বিদ্রোহী প্রার্থী হন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন স্বপন। আবু তাহেরকে সমর্থন দেন মুস্তফা কামাল ও সদর আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার। অন্যদিকে সাজ্জাদ হোসেনকে সমর্থন দেন রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক। কয়েক ভোটে হেরে যান সাজ্জাদ। এ নিয়ে মুস্তফা কামাল ও মুজিবুল হকের মধ্যে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ ছিল। তবে বরুড়ার এক জনসভায় ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেন দুজনই।
    কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের কোন্দল চরম আকার ধারণ করে। এ নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ সদস্য বাহাউদ্দিন বাহারের পছন্দের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাতকে মনোনয়ন না দিয়ে দেওয়া হয় কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আফজল খানের মেয়ে আনজুম সুলতানা সীমাকে। নির্বাচনে সীমা পরাজিত হলে দলের কোন্দল নিয়ে বেশ আলোচনা হয় দেশজুড়ে। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারকে সভাপতি ও আরফানুল হক রিফাতকে সাধারণ সম্পাদক করে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি করা হয়।

    No comments

    Post Top Ad

    ad728

    Post Bottom Ad