Header Ads

  • Breaking News

    প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যবাহী মসজিদ


    ‘ষাটগম্বুজ মসজিদ’ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। ইসলাম ধর্মের প্রচারক সেনাপতি হজরত খানজাহান আলী (রহ.) ৫৭৩ বছর আগে তত্কালীন খলিফাতাবাদ রাজ্যের রাজধানীতে এটি নির্মাণ করেন, যা বর্তমান বাগেরহাট শহরতলির সুন্দরঘোনায় বাগেরহাট-খুলনা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত।  ইতিহাস গবেষক ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মতে, ১১৪০ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদ নির্মাণে সময় লেগেছিল ১০ থেকে ১২ বছর। বাংলাদেশের প্রাচীন আমলে নির্মিত মসজিদগুলোর মধ্যে এটি সর্ববৃহত্। মসজিদটি পোড়ামাটির সরু ইট দিয়ে তৈরি। কালো পাথরখণ্ড দিয়ে ৬০টি পিলারের ওপর দাঁড়ানো এই মসজিদের চারকোণে ৪টি মিনার রয়েছে। নামে ষাটগম্বুজ হলেও মসজিদে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৮১টি গম্বুজ রয়েছে। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, সংস্কৃত শব্দ ‘সাত’ ও ফরাসি শব্দ ‘ছাদ’ ব্যবহারে মসজিদটির নাম ‘ছাদ গম্বুজ’ তথা ‘ষাট গম্বুজ’ হয়েছে। আবার অন্যরা বলছেন, ৬টি সারিতে ১০টি করে সর্বমোট ৬০টি পিলারের ওপর মসজিদটি নির্মিত বলে নাম হয়েছে ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ’।  

    সম্রাট ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমলে সেনাপতি খানজাহান আলী (রহ.) সাম্রাজ্য বিস্তার ও ইসলাম ধর্ম প্রচারে নির্দেশিত হয়ে বাগেরহাট অঞ্চলে আসেন। ঐতিহাসিকদের মতে, খানজাহান আলীর (রহ.) বিশাল সৈন্যবাহিনীসহ মানুষের সুপেয় পানি ও নামাজ আদায় করতে এই অঞ্চলে ৩৬০টি বিশাল দীঘি ও ৩৬০টি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। মসজিদের মধ্যে ষাটগম্বুজ মসজিদ সর্ববৃহত্। এর পশ্চিম পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক ‘ঘোড়া দীঘি’। পূর্ব-উত্তর কোণে রয়েছে ‘কোদাল ধোয়া দীঘি’।  

    ষাটগম্বুজ মসজিদের দৈর্ঘ্য ১৫৯ ফুট ৮ ইঞ্চি। প্রস্থ ১০৮ ফুট ৬ ইঞ্চি। মসজিদের ভেতরের আয়তন লম্বায় ১৪৩ ফুট ৩ ইঞ্চি, প্রস্থ ৮৮ ফুট ৬ ইঞ্চি। মেঝে থেকে ১৩ ফুট ওপরে ওঠার পর ৬০টি পিলারের ওপর ৭৭টি গম্বুজ ও ৪ কোণে চারটি মিনার গম্বুজ রয়েছে। মিনার গম্বুজগুলোর ২টির মধ্য দিয়ে তৈরি স্থায়ী পেঁচানো সিঁড়িপথ রয়েছে। এর একটিকে বলা হয় রওশন কোঠা, অপরটিকে বলা হয় আন্ধার কোঠা। 

    আগে এই  ২টি মিনার আজান দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হতো। মসজিদটির পূর্ব দেয়ালে ১১টি প্রবেশপথ রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ৭টি করে মোট ১৪টি দরজা রয়েছে। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে ১০টি মেহরাব রয়েছে। মেহরাবগুলোর বিপরীতে পূর্ব দেয়ালে রয়েছে একেকটি করে দরজা। কোনো বিপদ সঙ্কেত পেলে খানজাহানের সৈন্যরা পূর্বদিকের দরজা দিয়ে দ্রুত বের হয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে পারত। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে ১০টি মেহরাব ও ১টি ছোট দরজা। এই ছোট দরজাটি হজরত খানজাহান আলী (রহ.) ব্যবহার করতেন বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা। বর্তমানে এই দরজা দুই ঈদের নামাজে ভিভিআইপি মুসল্লিরা ব্যবহার করেন। এসব মেহরাব পাথর দিয়ে বড় আকারে তৈরি ও পাথরের ওপর কারুকার্য করা রয়েছে।  

    জানা যায়, ষাটগম্বুজ মসজিদ এক সময় গাছপালায় আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে। ১৯০৪ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রথম এই মসজিদের কয়েকটি খাম্বা সংস্কার করা হয়। গ্রিক স্থাপত্যধারায় নির্মিত এই মসজিদটি বড় ধরনের সংস্কার করা হয় ইউনেস্কোর অর্থায়নে প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর বিভাগ পাহাড়পুর ও বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ সংস্কার প্রকল্পের মাধ্যমে ২০০১ সালে।  

    ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ দেখতে ও এখানে নামাজ আদায় করতে প্রতিদিন শত শত দেশি-বিদেশি পর্যটক আসেন। মসজিদটিতে মেয়েদের জন্য নামাজের আলাদা ব্যবস্থা থাকায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মিলনমেলায় পরিণত হয় শুক্রবার জুমার সময়। তাছাড়াও এদিকে দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহত্ ঈদের জামাত হয় ষাটগম্বুজ মসজিদে। জামাতে দেশ-বিদেশের প্রায় অর্ধলাখ মুসল্লি অংশ নেন। 

    বাগেরহাটবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সাল থেকে জেলা প্রশাসন ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা দেয়। ষাটগম্বুজ মসজিদের ইমাম হেলাল উদ্দিন বলেন, ঈদের দিন মোট তিনটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়।  সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি একজন কাস্টোডিয়ানের অধীনে মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিনসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদের দেখভাল করে থাকে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা সরকার নির্ধারিত টিকিট কেটে মসজিদটি ঘুরে দেখতে পারেন। তবে মুসল্লিদের ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ে কোনো টিকিট লাগে না। এই মসজিদ কমপ্লেক্স এলাকায় একটি জাদুঘর, রেস্ট হাউস রয়েছে।

    No comments

    Post Top Ad

    ad728

    Post Bottom Ad