Header Ads

  • Breaking News

    ২৪ দিন পরও ক্ষয়ক্ষতির তালিকা চূড়ান্ত হয়নি

    রাঙামাটি শহরের মোনঘর এলাকার বাসিন্দা চিকনবি চাকমা। গত ১৩ জুন ভোরে তাঁর ঘরের এক পাশের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। পরিবার নিয়ে তাঁর ঠাঁই হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রে। প্রতিদিন একবার তিনি নিজের বিধ্বস্ত ঘর দেখতে আসেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের তালিকায় তাঁর নাম ওঠেনি।
    রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং সম্পদের ক্ষতির যে তালিকা জেলা প্রশাসন করেছে, তা পূর্ণাঙ্গ নয় বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন। তাঁরা বলছেন, যে তালিকা করা হয়েছে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক ব্যক্তির নাম নেই। ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকার নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এমনকি ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণও তালিকায় নেই। অথচ ১৩ জুনের পাহাড়ধসের পর ২৪ দিন পেরিয়ে গেছে।
    জেলা প্রশাসনের তালিকায় রাঙামাটি পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মোনঘর এলাকার নামই নেই। পাহাড়ধসে মোনঘর এলাকায় শিশুসহ দুজন নিহত হন। নিহত ব্যক্তিদের তালিকায় ওই দুজনের নাম থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের তালিকায় মোনঘর এলাকার কারও নাম নেই। অথচ এই এলাকায় অনেকের বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।
    জেলা প্রশাসনের তালিকায় পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাঙ্গাপানি এলাকার মাত্র ছয়জন ক্ষতিগ্রস্তের নাম রয়েছে। অথচ সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি বলে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান। এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রবি কান্তি চাকমা সংবাদ প্রতিদিনকে বলেন, তালিকায় বাদ পড়া অনেকে তাঁর কাছে আসছেন। তিনি তাঁদের ক্ষয়ক্ষতি সরজমিনে দেখে নাম তালিকাভুক্ত করার জন্য সুপারিশ করে পৌরসভায় পাঠাচ্ছেন।
    পাহাড়ধসের কারণে প্রত্যন্ত এলাকায় অনেকের ফল ও অর্থকরী গাছের বাগান ধ্বংস হয়েছে। যে অতিবৃষ্টিকে পাহাড়ধসের প্রত্যক্ষ কারণ বলা হচ্ছে, সেই অতিবৃষ্টিতে হ্রদের পাড়সহ নিচু এলাকায় অনেকের খেতের আধা পাকা ধান তলিয়ে গেছে। এমন অনেকের নাম ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের তালিকায় নেই বলে জানান রাঙামাটি সদর উপজেলার চেয়ারম্যান অরুণ কান্তি চাকমা।
    পাহাড়ধসে কিছু মানুষের বাড়িঘর না ভাঙলেও তারা জীবিকার সব অবলম্বন হারিয়েছে। এ ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নাম যুক্ত করে তালিকা চূড়ান্ত করার জন্য জেলা প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান সদর উপজেলার চেয়ারম্যান। তাঁর দাবি, যাঁরা পাহাড়ধসে জীবিকার অবলম্বন হারিয়েছেন, তাঁদের অন্তত এক বছর সরকার থেকে রেশন দেওয়া প্রয়োজন।
     পাহাড়ধসে যাঁদের বন, বাগান ধ্বংস হয়েছে, তাঁদের সরকারি সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সম্প্রতি জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির বিশেষ সভায় তুলেছেন রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র মো. আকবর হোসেন।
    জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সপ্তাহখানেক আগে পাহাড়ধসে ক্ষয়ক্ষতি-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়, পৌরসভাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী পাহাড়ধসে রাঙামাটি জেলার দুটি পৌরসভাসহ ১০টি উপজেলায় কমবেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলায় ১২০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে রাঙামাটি পৌরসভা এলাকায় পাঁচজন সেনাসদস্যসহ ৭৩ জন, কাউখালী উপজেলায় ২১ জন, কাপ্তাইতে ১৮ জন, জুরাছড়িতে ৬ জন ও বিলাইছড়ি উপজেলায় ২ জন। আহত হয়েছেন ১৯২ জন।  
    জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রতিবেদনে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত লোকের সংখ্যা ১ লাখ ২৩ হাজার ১২৭ জন উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা বলা হয়েছে ১৮ হাজার ৫৫৮টি। জেলায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত বাড়িঘরের সংখ্যা ১ হাজার ২৩১টি। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ৯ হাজার ৫৩৭টি। এর মধ্যে রাঙামাটি পৌর এলাকায় ১৯১টি বাড়িঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং ৩৭৪টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
    জেলার ১০টি উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়ন ৫০টি। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৭০৮ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ৯ দশমিক ৪২ কিলোমিটার সড়ক সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে সড়কের ক্ষয়ক্ষতি টাকার অঙ্কে কত প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করা হয়নি।
    পাহাড়ধসের পর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ নিয়ে সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার সংবাদ প্রতিদিনকে বলেন, প্রত্যন্ত এমন অনেক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে যে সেখানকার লোক এসে না জানালে শহরে বসে তা জানা সম্ভব নয়। ক্ষতিগ্রস্ত সব মানুষকে নিজ নিজ ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জেলা প্রশাসনকে জানানোর অনুরোধ জানান তিনি।
    তালিকায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক মানুষের বাদ পড়ার বিষয়ে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মো. মানজারুল মান্নান সংবাদ প্রতিদিনকে বলেন, তালিকায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নাম যুক্ত করার সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি। এ রকম যদি কেউ থাকেন তিনি তথ্য দিলে তাঁর নাম তালিকাভুক্ত করা হবে। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে পুরো জেলার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি এত ব্যাপক যে পুরো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। পরে এই পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
    জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ উপজেলায় ১ হাজার ৮৯৯ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসলাদির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ৯৩০ হেক্টর জুমচাষ, ৮০ হেক্টর আউশ চাষযোগ্য জমি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ছাড়া রাঙামাটি শহরের ১০টি পর্যটন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও টাকার অঙ্কে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
    রাঙামাটি শহরের ১৫টি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ব্যক্তিমালিকানাধীন শতাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। তবে প্রতিবেদনে মোট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়। অবশ্য সঠিকভাবে সব ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হলে তা এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকেই।
    জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বিশ্বনাথ মজুমদার সংবাদ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করেছি। সেখানে বেসরকারি, সরকারি ও ব্যক্তিগত ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করাও সম্ভব হয়নি। ইতিমধ্যে কিছু বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির, পুলিশ ক্যাম্প, সেনা ক্যাম্পসহ পাঁচটি সরকারি ভবন, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, বন, মৎস্য খামার, পুকুর, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ শ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত তা এক হাজার কোটি টাকায় যাওয়া অসম্ভব নয়।
    জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগ সড়কের ক্ষয়ক্ষতির একটি হিসাব করেছে। ওই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. এমদাদ হোসেন সংবাদ প্রতিদিনকে বলেন, প্রাথমিকভাবে সড়কের ক্ষতির পরিমাণ ৬৫ কোটি টাকার বেশি হবে। তিনি আরও বলেন, জেলার বিভিন্ন সড়কে ১১৩টি স্থানে ভাঙন ও ১৪৫টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। কিছুদিন পর ঢাকা থেকে একটি প্রতিনিধিদল রাঙামাটি আসবে। তারা প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করবে। - নিজস্ব প্রতিবেদক, সংবাদ প্রতিদিন

    No comments

    Post Top Ad

    ad728

    Post Bottom Ad